শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক

এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম নেতা জনাব আবুল কাশেম ফজলুল হক সাহেবের মহাপ্রয়াণে সমগ্র দেশ শোকে মুহ্যমান হইয়াছিল ৷ এই ব্যক্তিত্বসম্পন বিরাট পুরুষ এই দেশের গণমানবের আত্মার আত্মীয় ছিলেন।

জন্ম: জনাব ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬শে অক্টোবর বর্তমান পিরোজপুর জেলার অন্তর্গত ‘চাখার’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা মৌলভী মুহম্মদ ওয়াজেদ আলী ছিলেন ভূতপূর্ব বরিশালের খ্যাতনামা আইনজীবীদের অন্যতম। তিনি প্রথমে কলিকাতা হাইকোর্টে ওকালতি আরম্ভ করেন, পরে বরিশালে আসিয়া সুনাম অর্জন ও বিপুল অর্থ উপার্জন করেন। দীর্ঘকাল তিনি বরিশালের সরকারী উকিলের পদেও নিযুক্ত ছিলেন।

আর্থিক অবস্থা:

তিনি বিত্তবান পিতার একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন। ঐশ্বর্যের ক্রোড়ে লালিত-পালিত হইলেও বিদ্যাচর্চায় তাহার অশেষ অনুরাগ ছিল। গৃহেই তাহার আরবী, ফার্সী ও উর্দু শিক্ষার সূচনা হয়। ১৪ বৎসর বয়সে তিনি বরিশাল জেলা স্কুল হইতে প্রথম শ্রেণীর বৃত্তি ও পারিতোষিকসহ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কলিকাতার শিক্ষাজীবন :

অতঃপর তিনি কলিকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ হইতে কৃতিত্বের সহিত এফ. এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরে রসায়নশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা ও গণিতে অনার্সসহ বি. এ. পাস করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি অঙ্কশাস্ত্রে এম. এ. পাস করিয়া অধুনালুপ্ত বরিশাল রাজচন্দ্র কলেজের অধ্যাপক পদ প্রাপ্ত হন ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতশাস্ত্রের এফ. এ পরীক্ষার পরীক্ষক নিযুক্ত হন। তিনি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হইয়াও ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ জ্ঞানলাভ করেন। তিনি ইংরেজী বক্তৃতায় সাহিত্য সৃষ্টি করিতেন। বাংলা ভাষায়ও তিনি আবেগময়ী বক্তৃতা দিতে পারিতেন। এতদ্ব্যতীত উর্দু ও ফার্সী ভাষায়ও অনর্গল বক্তৃতা দিতে

পারিতেন। তাঁহার কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রনাদী, চিত্তাকর্ষক এবং তাহার ভাষা অলংকারে সমৃদ্ধ।

এটিও পড়ুন – আবুল ফজল প্রাবন্ধিক এবং কথাশিল্পী’র জীবনী

অন্যক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি:

বাল্যকাল হইতেই খেলাধুলার প্রতি তাঁহার অত্যন্ত অনুরাগ ছিল। ফুটবল ও ক্রিকেটের প্রতি তাঁহার সবিশেষ অনুরাগ ছিল। তিনি দাবাখেলা ও সন্তরণে নিতান্তই পটু ছিলেন। নদীপথে ভ্রমণকালে দুই দুইবার অন্ধকার রাত্রিতে তাহার নৌকাডুবি হয়। তিনি সন্তরণ করিয়া নিরাপদে কূলে উত্তীর্ণ হন এবং সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন যাত্রীকেও বাহু প্রসারিত করিয়া তীরে লইয়া আসেন।

বিবাহএম. এ পাস করিয়াই তিনি উচ্চ পরিবারে বিবাহ করেন। পর্তু খুরশীদ তালাত বেগম দুইটি কন্যা সন্তান রাখিয়া ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁহার প্রথম কন্যার বিবাহ হয় আপন ভাগ্‌নে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর উজীর আলীর সহিত এবং দ্বিতীয় কন্যার বিবাহ হয় উলানিয়ার জমিদার পুত্র ফজলুর রহীম চৌধুরী এম. এ.-এর সহিত। ১৯৪৩ সালে তিনি মীরাটের এক মহিলার সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। এই বিবাহে তাঁহাদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

কর্ম জীবন১৮৯৭ সালে তিনি বি. এল. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি স্বন” খ্যাত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহকারীরূপে হাইকোর্টে যোগদান করেন। স্যার আশুতোষ তাহাকে অত্যন্ত প্রীতির চোখে দেখিতেন। তাঁহার সাহচর্যে তিনি তাঁহার চরিত্রের উদারতা ও তেজস্বিতা দ্বারা প্রভাবিত হন। স্যার আশুতোষকে বলা হইত ‘টাইগার অব বেঙ্গল’ আর উত্তরকালে ফজলুল হক আখ্যা পাইয়াছিলেন শের-এ-বাংলা

 

পত্রিকা সম্পাদনাঃ তিনি বরিশালে অধ্যাপনাকালে ‘বালক’ নামে ছোটদের একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। অনেক কাল পরে তিনি কলিকাতা হইতে ‘‘নবযুগ’ নামক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ইহার সম্পাদক।

হাইকোর্টে যোগদান১৯০৬ খ্রীস্টাব্দে তিনি আইন ব্যবসায় পরিত্যাগ করিয়া ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ গ্রহণ করেন। সরকারের সহিত মতানৈক্যহেতু তিনি ১৯১১ সালে চাকরি ইস্তফা দিয়া পুনরায় কলিকাতা হাইকোর্টে যোগদান করেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ : ১৯১৩ সালে তিনি সর্বপ্রথম ঢাকা বিভাগ হইতে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তদবধি বাঙালীর প্রিয়তম জননেতা ‘হক সাহেব’ প্রতি নির্বাচনে বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করেন।

লক্ষ্ণৌ চুক্তি ঃ ১৯১৬ সালে তিনি লক্ষ্ণৌ নগরে লীগ-কংগ্রেসের যুক্ত অধিবেশনে যোগদান পূর্বক এক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন যে, ভারতের সকল ব্যবস্থাপক পরিষদে শতকরা তেত্রিশটি আসন মুসলিমগণ লাভ করিবে। এই প্রস্তাব গৃহীত হইলে ইহা ‘লক্ষ্ণৌ চুক্তি’ নামে অভিহিত হয়। ১৯১৮ সালে তিনি ভারতীয় কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। এই বৎসরই তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগেরও প্রেসিডেন্ট পদে বৃত হন। কংগ্রেসের সেক্রেটারি হিসাবে তিনি যে রিপোর্ট প্রস্তুত করেন এবং ১৯০৯ সালে লীগের প্রেসিডেন্ট হিসাবে যে ভাষণ দেন, তাহা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে। তিনি উভয়ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসনের নৈরাশ্যজনক অবস্থার কথা বর্ণনা করেন। ১৯২০ সালে তিনি মেদিনীপুর প্রাদেশিক কংগ্রেস অধিবেশনের সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেন এবং এক হৃদয়গ্রাহী ও উদ্দীপনাময় ভাষণ প্রদান করেন।

শিক্ষানুরাগী : ১৯২৪ সালে দ্বৈত শাসনকালে তিনি শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে কতিপয় স্কুল-কলেজ স্থাপন করিয়া দেশের শিক্ষার পথ সুগম করেন। কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজ লেডী ব্রাবোর্ন কলেজ, ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রীনিবাস তাহারই বিদ্যোৎসাহিতার পরিচয় বহন করে।

১৯৩৫ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর হক সাহেব লীগ-প্রজা সম্মিলিত মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ছয় বৎসর কাল অবাধে উহার কার্য চলে। তদানীন্তন বাংলার গভর্ণর স্যার হার্বার্টের সঙ্গে তাঁহার নীতিগত মতভেদ ঘটিলে তিনি ১৯৪৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ পরিত্যাগ করেন।

১৯৩৫ সালে তিনি কলিকাতা করপোরেশনের কাউন্সিলারদের ভোটে মেয়র হন। তিনি তথাকার প্রথম মুসলিম মেয়র।

‘শের-এ-বাংলা’ উপাধি লাভ : ১৯৪০ সালে লাহোরে যে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশন হয় তাহাতে তিনি পাকিস্তান প্রস্তাবের ব্যাখ্যা করিয়া জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন এবং উহা পেশ করেন। পাঞ্জাবের মুসলমানেরাই তাহাকে ‘শের-এ-বাংলা’ উপাধি দানে সম্মানিত করেন। তদবধি এই নামেই তিনি সুপরিচিত। ঢাকায় প্রত্যাবর্তন ১৯৪৮ সালে তিনি কলিকাতা পরিত্যাগ করিয়া

স্থায়িভাবে ঢাকায় বসবাস করিতে থাকেন এবং ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায়ে ব্যাপৃত হন। ১৯৫২ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের এ্যাডভোকেট জেনারেল পদ প্রাপ্ত হন। ১৯৫২ সালের নির্বাচনের পূর্বে হক সাহেব ‘কৃষক-শ্রমিক দল গঠন করেন। তাঁহার এই দুলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ’, ‘নেজামে ইসলাম দলের সংযোগ সাধন করিয়া তিনি ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করেন এবং নির্বাচনী সংগামে অবতীর্ণ হন। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নিকট মুসলিম লীগ শোচনীয়রূপে পরাজিত হয়। অতঃপর তাঁহার অধিনায়কত্বে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ গত হইতে না হইতে তাঁহার মন্ত্রিসভা বাতিল হইয়া যায় এবং এদে ৯২ (ক) ধারা প্রবর্তিত হয়। এই ধারা কয়দিন পর প্রত্যাহৃত হইলে পুনরার পার্লামেন্টারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তিনি এই সময় নবগঠিত মন্ত্রিসভার যোগদানে বিরত থাকেন। পরবর্তীকালে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ লাভ করেন। তৎপর শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পর ১৯৫৬ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গঙর্ণর নিযুক্ত হইয়া উক্ত পদে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সমাসীন থাকেন।

মৃত্যু ১৯৬২ সালে ইউরেশিয়া রোগে আক্রান্ত হইয়া তিনি ঢাকা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার্থে ভর্তি হন। চিকিৎসায় স্বাস্থ্যের কিঞ্চিৎ উন্নতি হইলেও পরে অবনতি ঘটে। ১৯৬২ সালের ২৭শে এপ্রিল শুক্রবার মধ্যাহকালে এই জনপ্রিয় জননায়কের জীবনাবসান ঘটে। সেদিন প্রভাতে তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় মোনাজাত করেন, ‘আল্লাহ, আর কষ্ট সইতে পারি না, তোমার নিকট লইয়া চল।” সমগ্র বাংলায় শোক প্রকাশের জন্য সমুদয় সরকারী ও বেসরকারী ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়। পরদিন পূর্বাহ্রে সাড়ে দশটার সময় ঢাকার বহিরস্থ ক্রীড়াভূমিতে (outer stadium) লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে মহামান্য নেতার জানাযা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় এবং ঢাকা হাইকোর্টের এলাকায় তাহার মরদেহ সমাহিত হয়।

দরিদ্রের বান্ধবতিনি ছিলেন দরিদ্রের বান্ধব। তিনি বিনা ফিসে নিপীড়িত

দরিদ্র মক্কেলের মকদ্দমা করিয়া দিতেন। এমনও হইয়াছে যে, তাঁহাকে মকদ্দমার শেষে ধার করিয়া মফস্বল হইতে ফিরিতে হইয়াছে। তিনি দরিদ্র ছাত্রদের যথাসাধ্য সাহায্য করিতেন। শুনা গিয়াছে প্রয়োজনবোধে তিনি স্বীয় পত্নীর অলংকারও বন্ধক রাখিয়াছিলেন। তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রীরূপে ‘মহাজন আইন’, ‘কৃষিখাতক আইন’ প্রভৃতি প্রণয়নে নিপীড়িত জনগণের অশেষ কল্যাণ সাধন করেন। ‘ঋণশালিশী বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করিয়া তিনি বাংলার গরীব প্রজাদের অশেষ উপকার করেন। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাই ছিল তাহার আইন ব্যবসায়ের একমাত্র লক্ষ্য।

উপসংহার : উপমহাদেশের এই প্রাচীনতম নেতার বিদ্যাবুদ্ধি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা যে কোন দেশের জননেতার গৌরবের সামগ্রী। মনীষা তাহার নেতৃত্বের মূলীভূত কারণ ছিল না। আকাশের মত উদার ও বিরাট হৃদয় ছিল তাহার জনপ্রিয়তার মূল হেতু। শিশুর মত নরম ছিল তাহার অন্তর ; স্বভাবে, চিন্তা-ভাবনায়, চাল-চলনে তিনি ছিলেন অকপট। নিজের স্বভাব ধর্ম হইতে তিনি কদাপিও বিচ্যুত হন নাই। এইজন্যই এ দেশের মাটির মানুষের নাড়ীর সহিত আমৃত্যু তাঁহার নিবিড় সংযোগ ঘটিয়াছিল।