গিরিশচন্দ্র ঘোষ (Girish Chandra Ghosh) (২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৪ – ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯১২) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাঙালি সংগীতস্রষ্টা, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যপরিচালক ও নট। বাংলা থিয়েটারের স্বর্ণযুগ মূলত তারই অবদান।

১৮৭২ সালে তিনিই প্রথম বাংলা পেশাদার নাট্য কোম্পানি ন্যাশানাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। গিরিশচন্দ্র প্রায় চল্লিশটি নাটক রচনা করেছেন এবং ততোধিক সংখ্যক নাটক পরিচালনা করেছেন। জীবনের পরবর্তী ভাগে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের এক বিশিষ্ট শিষ্য হয়েছিলেন।

নাট্যচার্য গিরিশচন্দ্র:

[ প্রসঙ্গসূত্রঃ ভূমিকা শৈশব ও শিক্ষা ; কর্মজীবন ও নাট্যচর্চা; নাট্যআন্দোলন ; নাট্যসাহিত্যবিচার ; মৃত্যু ও উপসংহার। ]

‘আমি সখ করিয়া নাটক লিখি নাই,

আমাকে বাধ্য হইয়া নাটক লিখিতে প্রবৃত্ত হইতে হইয়াছে।’

—গিরিশচন্দ্র ঘোষ

বাঙলার শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, অভিনেতা, নটগুরু, নাট্যপরিচালক, স্থায়ী রঙ্গমঞ্চের পরিপোষ্টা এবং অভিনয় শিক্ষক গিরিশচন্দ্র ঘোষ বঙ্গরঙ্গমঞ্চ ও নাটককে অবজ্ঞা ও তুচ্ছতার অগৌরব থেকে তুলে যৌবনের বলিষ্ঠতা এবং পরিণতি দান করেছেন। নাটকের ইতিহাসে নট ও নাট্যকার ভূমিকা গিরিশচন্দ্রের ভূমিকা ও অবদান প্রায় অতুলনীয়। তাঁর অলৌকিক অভিনয় নিপুণতার জন্য দর্শকের মনে অবিস্মরণীয় রসমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। গিরিশচন্দ্র ও তাঁর অনুগামীদের প্রচেষ্টায় বাংলা নাট্য ও নাট্যমঞ্চ স্বর্ণযুগে পরিণত হয় অথচ আজ বাংলা নাটক ও রঙ্গমঞ্চের দিকে দৃষ্টিপাত করলে কষ্ট হয়, বেদনা অনুভব করি। বাংলা নাটকের আদর্শ এখন হিন্দী নাটক। খুন, রাহাজানি, মারপিট, দেহপ্রদর্শন, পপসঙ্গীত, ক্যারাটে, ড্যান্স প্রভৃতি সস্তা চটক এর উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৌলিকতাবর্জিত রুচিহীন অপসংস্কৃতি চর্চায় বাংলা নাটক নিমজ্জিত। নাট্যকার ও নাট্যাচার্যের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলা নাটক ও নাট্য-আন্দোলনকে নতুন ও প্রগতিশীল পথে পরিচালনা করাই হবে তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শিক্ষা  ও শৈশব

১৮৪৪ খ্রীস্টাব্দের ২৮শে ফেব্রুয়ারি গিরিশচন্দ্র ঘোষ কলকাতার বাগবাজারে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নীলকমল ঘোষ এবং মাতার নাম রাইমণি দেবী। পিতার কাছ থেকে তিনি বিষয়বুদ্ধি এবং মাতার কাছ থেকে কাব্যানুরাগ ও ভক্তি পেয়েছিলেন। আট বছর বয়সে তিনি ‘ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে এবং পরে হেয়ার স্কুলে ভর্তি  হন। পিতা-মাতা এবং অগ্রজের মৃত্যুর জন্য তাঁর বিদ্যায়তনিক পড়াশুনা বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হন। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি বিবাহ করেন। অসৎ-সংসর্গের ফলে তিনি পানাস, উচ্ছৃঙ্খল ও স্বেচ্ছাচারি হয়ে পড়েন। কুড়ি বছর বয়সে অ্যাটকিনসন টিলকন কোম্পানীতে শিক্ষানবিস রূপে যোগ দিয়ে অচিরেই একজন দক্ষ ‘বুককিপার’ হন। স্কুল কলেজের শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও বন্ধু ব্রজবিহারী সোমের প্রভাবে তিনি খুব পড়াশুনা করেন। দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, পুরাণ, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতি ছিল তাঁর নিত্যসহচর।

কর্মজীবন ও নাট্যচর্চা

প্রথম জীবনে গিরিশচন্দ্র ঘোষ হাফ আখড়াই দলের বাঁধনদার ছিলেন। ১৮৬৭ খ্রীস্টাব্দে বাগবাজার যাত্রাদল প্রযোজিত মধুসূদন রচিত ‘শমিষ্ঠা’ নাটকের গীতিকার রূপে নাট্যজগতে গিরিশচন্দ্রের অনুপ্রবেশ ঘটে। তারপর দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী প্রহসন নাটকে অভিনয় করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দে ‘বাগবাজারের এমেচার থিয়েটার’ “শ্যামবাজার নাট্যসমাজ’ নাম গ্রহণ করে এবং ‘ন্যাশনাল থিয়েটার’ নামে এক পেশাদারী রঙ্গমঞ্চ স্থাপন করে। মতভেদের জন্য কয়েকজন অনুগামী নিয়ে গিরিশ ঘোষ দলত্যাগ করেন। ১৮৮০ খ্রীস্টাব্দে পার্কার কোম্পানীর ১৫০ টাকা বেতনের চাকুরী ছেড়ে মাত্র ১০০ টাকা বেতনে রূপচাদ জহুরীর ‘গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ম্যানেজার হন। এই সময় নটী বিনোদিনীর রূপে আসক্ত এক মারোয়াড়ী যুবক ‘স্টার’ থিয়েটার স্থাপন করেন। গিরিশ ঘোষ এখানে সদলে যোগ দেন এবং নাট্যকার, অভিনেতা, অভিনয় শিক্ষক এবং নাট্যপরিচালক রূপে কাজ করেন। বাংলা রঙ্গমঞ্জের এক নতুন অধ্যায়ের জয়যাত্রা শুরু হয়। গিরিশচন্দ্র রচিত ও পরিচালিত চৈতন্যলীলা’ (১৮৮৪) নাটকের জনপ্রিয়তায় অনুপ্রাণিত হয়ে অবতার-বরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ নাটপ্রদীপের তলায় এসে উপস্থিত হন, অভিনেত্রী বিনোদিনী তথা বাংলা নাটককে তিনি আশীর্বাদ করেন। সেই দিবা আশীর্বাদের সুফল হয় সুদূরপ্রসারী। এখন থেকে তাঁর ধর্মে অনুরাগ জন্মে এবং শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে এইভাবে তিনি এমারেল্ড, মিনার্ভা, ক্লাসিক, কোহিনূর প্রভৃতি রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা এবং ক্রমোন্নতির জন্য আত্মনিয়োগ করেন। সে যুগে প্রাম, প্রত্যেকটি রঙ্গমঞ্চে তাঁর প্রভাব প্রতিফলিত হয়।

গিরিশচন্দ্র নিয়মিত ইংরাজী অভিনয় দেখতেন। সেই অভিজ্ঞতা অনুচর কুশীলবদের দেখিয়ে অভিনয়ে উৎকর্ষ আনার চেষ্টা করতেন। অশিক্ষিতা হীনশ্রেণীর স্ত্রীলোকদেরকে পাখি

নাট্যআন্দোলন

পড়ানোর মত করে শিক্ষা দিতেন। তাঁর শিক্ষা নৈপুণ্যে এইসব রমণী পরবর্তীকালে বিখ্যাত হয়েছিল। অবহেলিত বাংলা নাট্যাভিনয় একটা শিল্পের মর্যাদা লাভ করে। অভিনেতারা তাঁকে ‘নটগুরু’, ‘নাট্যাচার্য’-এর আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। নাটককে তিনি জাতীয় জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রেরণায় অগণ্য নট-নটী নাট্যকার-নাটক বাংলা নাট্যমঞ্চ পূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলা নাট্যমঞ্চকে তিনি একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় উত্তীর্ণ করেন।

নাট্যসাহিত্য বিচার

গিরিশচন্দ্র সবশুদ্ধ পঁচাত্তর খানি সম্পূর্ণ ও চারখানি অসম্পূর্ণ নাটক-নাটিকা-প্রহসন রচনা করেন। এইসব নাটকে দেশপ্রেম ও ধর্মোন্মাদনা উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। এইসব নাটকের ভক্তি-স্নেহ-প্রেমের হৃদয়বৃত্তির অতিকথন সমকালীন দর্শকের ভাবুকতাকে আবেগপ্লুত করে তুলেছিল। এই আবেগবৃত্তি ও ভাবালুতার পথ ধরেই তাঁর রচনার নাটকীয় অসংযম ও পরিমিতি হীনতার অনুপ্রবেশ ঘটে। আগমনী, অকালবোধন, দোললীলা প্রভৃতি গীতিনাট্য নিয়ে তিনি রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হন। এগুলি মঞ্চসফল হলেও সাহিত্যগুণ বর্জিত।

পৌরাণিক নাটক রচনায় তিনি গৌরব লাভ করেন। তাঁর অভিমন্যু বধ, জন্য এবং পাণ্ডব গৌরব অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হয়। ভক্তিরস, অদৃষ্টবাদ, মহৎচরিত্রাদশ, নীতিধর্ম শ্রেষ্ঠ মানবধর্ম প্রভৃতি এই সব নাটকে সাফল্যের সঙ্গে অঙ্কিত করেছেন। ‘জনা’-কে তিনি বাংলা রঙ্গমঞ্চের একটি বিখ্যাত চরিত্রে পরিণত করেছিলেন। এই শ্রেণীর নাটকে তিনি ভারতীয় জীবন সাধনার নীতিগুলিকে সুকৌশলে প্রচার করেন। গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা, বিল্বমঙ্গল প্রভৃতি ভক্তিরসাশ্রিত নাটক সে যুগের নাট্যমঞ্চকে প্লাবিত করেছিল। এখানে তার অকপট হৃদয়ের পবিত্র আনন্দ-বেদনার কথাটি স্নিগ্ধতার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত তাঁর সিরাজদ্দৌল্লা, মীরকাশিম, ছত্রপতি শিবাজী প্রভৃতি ঐতিহাসিক নাটক উল্লেখযোগ্য। অহেতুক স্বাদেশিক উচ্ছ্বাস, স্থান-কাল-পাত্রের কালানৌচিত্য দোষ প্রভৃতি এই পর্যায়ের নাটকগুলিকে আধুনিক পাঠক ও দর্শকের রুচির প্রতিকূল করে তুলেছে। যুগের দাবি মিটলেও নাট্যসাহিত্যের দাবি মেটাতে তিনি ব্যর্থ হন। ‘প্রফুল্ল’, ‘হারানিধি’, ‘বলিদান’, ‘শাস্তি কি শান্তি’, ‘মায়াবসান’ প্রভৃতি তাঁর গার্হস্থ্যধর্মী ও সামাজিক নাটক পর্যায়ভুক্ত। এগুলিতে তদানীন্তন সমাজ ও পরিবারের সমস্যাসঙ্কুল উৎপীড়িত রূপটি ধরা পড়েছে। পারিবারিক বিরোধ, ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব, বিবাহ সমস্যা, বৈধব্য সমস্যা, লাম্পট্য, মাতলামী, জাল-জুয়াচুরি প্রভৃতির বাস্তব রূপ এই পর্যায়ের নাটকে রূপায়িত হয়েছে। তাঁর প্রফুল্ল নাটকটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পারিবারিক নাটক বলে চিহ্নিত। যোগেশের সামান্য চারিত্রিক দুর্বলতা থেকে কেমন করে সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল সেই মর্মন্তুদ ঘটনা এই পারিবারিক নাটকে অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে লেখা হয়েছে। তবে অতিনাটকীয়তা, খুন, জখম, মাতলামি প্রভৃতি ব্যাপারে বাড়াবাড়ির জন্য এর নাট্যরস কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। গিরিশচন্দ্রের ‘সপ্তমীতে বিসর্জন’, ‘বেল্লিকবাজার’, ‘বড়দিনের বকশিস’, ‘য়্যায়সা কি ত্যায়সা’ প্রভৃতি ব্যঙ্গমুখর নাটিকা নাট্যকারের অক্ষমতার জন্য হাস্য উদ্রেক করে। গিরিশচন্দ্র তাঁর নাটকে ভাঙা মিত্রাক্ষর ও অমিত্রাক্ষর পয়ার ছন্দের ব্যবহার করেছেন যা গৈরিকছন্দ নামে অভিহিত হয়েছে। গিরিশচন্দ্রের নাটকের সাহিত্যগুণ রচনা কৌশল উচ্চশ্রেণীর নয় তবে বাংলা নাটক ও নাট্যমঞ্চ গড়ে তিনি সে যুগের বাঙালী দর্শকের রুচি তৈরি করেছেন। সেই জন্য নাট্যসাহিত্যে চিরদিন তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

মৃত্যু ও উপসংহার

বাংলা নাট্যান্দোলনের দিশারি গিরিশচন্দ্র ঘোষ ১৯১২ খ্রীস্টাব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারি ইহলোক ত্যাগ করেন । একটা নাট্যযুগের অবসান ঘটে। নাট্যমোদী দর্শক, নাট্যানুরাগী ও অনুচরবৃন চোখের জলে শ্রদ্ধার্পণ করেন। নটগুরু, নাট্যাচার্যের নাট্যিক আদর্শ, সরকারী অনুচর ও কুশীলবদের প্রতি প্রীতিমিশ্রিত ব্যবহার, নাট্যআন্দোলনের অদম্য প্রচেষ্টা, অপরাজেয় মনন প্রভৃতি মহৎ আদর্শ আমাদের পাথেয় হোক । বাংলা নাটক ও নাট্যমঞ্চ স্বীয় মৌলিক পথে পরিচালিত হোক—

অনুরূপ প্রবন্ধ : নাট্যকার গিরিশচন্দ্র; বাংলা নাট্যআন্দোলনে গিরিশচন্দ্রের অবদান ; গিরিশচন্দ্রের নাট্যসমীক্ষা