বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় একজন বাঙালি কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও কবি। তিনি বনফুল ছদ্মনামেই অধিক পরিচিত। অবিভক্ত ভারতবর্ষের বিহার রাজ্যের মণিহারীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শিয়াখালা গ্রাম। তাঁদের পরিবার “কাঁটাবুনে মুখুজ্জ্যে” নামে পরিচিত ছিল

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়

বনফুল বাংলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, আসল নাম বলাইচাঁদ মুখােপাধ্যায়। পেশায় তিনি ছিলেন ডাক্তার। কিন্তু জীবনের বড় অংশ অতিবাহিত করেছেন সাহিত্যচর্চায়। বনফুল ছদ্মনামেই তিনি লেখালেখি করেছেন, তাই তার আসল নাম ঢাকা পড়ে গেছে।

বনফুলের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই (৪ শ্রাবণ, ১৩০৬), পূর্ণিয়া জেলার সাহেবগঞ্জের নিকটবর্তী মণিহারী গ্রামে। তাঁর পিতার নাম সত্যচরণ মুখােপাধ্যায়, মাতার নাম মৃণালিনী দেবী। বনফুলের পিতা ডাক্তার ছিলেন। চিকিৎসার সূত্রে তাঁদের বাড়িতে অনেক লােকজনের আসা যাওয়া ছিল। চারিত্রিক উদারতার জন্য সত্যচরণ তাঁদের আপন করে নিতেন। একারণে জমিদার থেকে সাধারণ মানুষসকলেরই ভালােবাসা পেয়েছিলেন সত্যচরণ। বনফুলের চরিত্র গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে তাঁর পিতার উদারতার দিকটি বিশেষ কার্যকারী হয়েছিল। গুণীজনের সন্ধান পেলে সত্যচরণ আপন গৃহে অতি যত্নে তাঁদের আপ্যায়ন করতেন। সেই সূত্রেই তারাপদ পণ্ডিত তার গৃহে আশ্রয় পান। তারাপদ পণ্ডিতের কাছেই বনফুলের হাতেখড়ি হয়। তারাপদ পণ্ডিতের স্নেহময় স্বভাব, সরলতা, সত্যবাদিতার কথা বনফুল পরবর্তী জীবনেও স্মরণ করেছেন।

বনফুলরা ছিলেন ছয় ভাই ও দুই বােন বলাইচাঁদ, ভােলানাথ, গৌরমােহন, লালমােহন, নির্মলকুমার, অরবিন্দ, বিমলা ও উমা। বনফুলের যখন দেড় বছর বয়স, তখন তাঁর ভাই ভােলানাথ মাতৃগর্ভে আসে। একারণে বনফুল মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত হন। বাড়ির এক মুসলমান মজুরনির স্তনদুদ্ধে স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠেন বনফুল। সেই মজুরনি তাঁর দুধ-মা। দুধ-মার সঙ্গে বনফুল ছােটবেলায় বনে বনে ঘুরে বেড়াতেন। এর ফলে তাঁর অরণ্যপ্রীতি জন্মায়। বনফুল’ ছদ্মনাম গ্রহণের নেপথ্যে এই দুধ-মার প্রভাব ছিল বলে মনে হয়।

মণিহারী প্রাইমারি স্কুলের পড়া শেষ করে বনফুল ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে সাহেবগঞ্জ রেলওয়ে হাইস্কুলে ভরতি হন। এই স্কুলে পড়তে পড়তে তিনি ‘বিকাশ’ নামে একটি হাতেলেখা পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর আগেই বনফুল দু-একটা কবিতা লিখেছিলেন। ১৯১৮ প্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এর পর ভরতি হন হাজারিবাগে সেন্ট কলম্বাস কলেজে। এখানে পরিচিত হলেন সাহিত্যিক সরােজকুমার রায়চৌধুরী ও কবি অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে। এরা দুজনেই তার সহপাঠী ছিলেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে আই.এস-সি. পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তারপর ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজে ভরতি হন। এখানে ছয় বছর পড়াশােনা করার পর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে পাটনায় মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হলে বিহার থেকে আসা ছাত্রদের সেখানে চলে যেতে হয়। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাটনা মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ডাক্তারি পাস করার পর ৪০ বছর তিনি ভাগলপুরে প্যাথলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন।

বনফুল অনেকগুলি উপন্যাস রচনা করেন। এগুলির মধ্যে রয়েছে—“তৃণখণ্ড’, দ্বৈরথ’, “কিছুক্ষণ’, ‘নির্মোক’, ‘মৃগয়া’, ‘রাত্রি’, ‘স্থাবর’ জঙ্গম’, ‘সপ্তর্ষি”, ‘অগনীশ্বর’, ‘মানদণ্ড’, “লক্ষ্মীর আগমন’, ‘পঞ্পর্ব, জলতরঙ্গ’, ‘হাটেবাজারে, ‘রৌরব প্রভৃতি। তাঁর গল্প-সংকলনের সংখ্যাও কম নয়। যেমন—“বনফুলের গল্প’, ‘বনফুলের আরও গল্প’, ‘বাহুল্য’, “বিন্দুবিসর্গ, ‘অদৃশ্যলােক’, ‘নবমঞ্জরী’, ‘বনফুলের গল্পসংগ্রহ’ (১ম ও ২য়), করবী’, ‘সপ্তমী’, ‘দূরবীন, ছিটমহল’, অদ্বিতীয়া’ প্রভৃতি। গল্প-উপন্যাস ছাড়া বনফুল কবিতা, নাটক, ব্যঙ্গ রচনা ও প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন।

১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পূজার দিন বনফুল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ইহলােক ত্যাগ করেন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য 

  • জন্ম: ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই।
  • জন্মস্থান: বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বনফুলের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার শিয়ালখালায়।
  • পিতা: সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়। তিনি পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন।
  • মাতা: মৃণালিনী দেবী।
  • ছোট ভাই: অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়
  • ভ্রাতুষ্পুত্র: অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়
  • স্ত্রী: লীলাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়(মুখোপাধ্যায়)
  • সন্তান:
    #বড়োমেয়ে: কেয়া মুখোপাধ্যায়
    #বড় ছেলে: অসীম মুখোপাধ্যায়#ছোটছেলে: রঞ্জন মুখোপাধ্যায়
    #ছোটমেয়ে: করবী মুখোপাধ্যায় (স্বামী: কাজলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের)
  • মৃত্যু: ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফ্রেব্রুয়ারি কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
  • ছদ্মনাম: বনফুল
  • উল্লেখযোগ্য রচনাবলিঃ সাত সমুদ্র তেরো নদীআকাশবাসীতুমি
  • উল্লেখযোগ্য পুরস্কারঃ জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মভূষণ

সোর্সঃ wikipedia.org