কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ((Navkrishna Bhattacharya) ) বিশিষ্ট কবি ও শিশুসাহিত্যিক। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ভারতের পশ্চিম বঙ্গের হাওড়ায় জেলায়। পিতার নাম রাজনারায়ণ তর্কবাচস্পতি।

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya) সংক্ষিপ্ত জীবনী

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya) শিশু সাহিত্যিক নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে  আমতায়, হাওড়ার নারিটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল ছবির ছড়া, বালক পাঠ, কবিতা কুসুম, সুখবোধ ব্যাকরণ, ছেলেখেলা ইত্যাদি। তিনি সখা পত্রিকার সম্পাদক এবং মাসিক বসুমতী পত্রিকার সহসম্পাদক ছিলেন। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়।

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya)

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya) গুরুত্বপূর্ণ লেখা

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya) শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন। তাঁর রচনার মধ্যে রয়েছে “শিশুরঞ্জন রামায়ণ” (১৮৯১), “ছেলেখেলা” (১৮৯৮), “টুকটুকে রামায়ণ” (১৯১০), “পুষ্পাঞ্জলী” (১৯৩৪), “ছবির ছড়া” (১৯৩৬) প্রভৃতি। তাঁর জনপ্রিয় বিখ্যাত কবিতার মধ্যে রয়েছে “গোকুলে মধু ফুরায়ে গেল আঁধার আজি কুঞ্জবন”, “মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি” প্রভৃতি।

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya) শিক্ষা জীবন

ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন নবকৃষ্ণ । তাঁর বাবা যেহেতু নৈয়ায়িক পণ্ডিত এবং টোল বা চতুষ্পাঠীর শিক্ষক তাই তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি বাবার কাছেই । সংস্কৃত ভাষা ও ব্যাকরণে তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি জন্মায় । পাশাপাশি প্রাকৃত ও বাংলা ভাষার চর্চা শুরু হয় ।
বর্ধিষ্ঞু পরিবারের সন্তান হয়েও নবকৃষ্ঞ ছোটবেলা থেকেই জমিজমা সম্পত্তির ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন । পড়াশোনা ও সংসারের কাজকর্মেই বেশি সময় কাটাতেন । তাঁর সাংসারিক কাজকর্ম বিষয়ে একটা মজার ছড়া প্রচলিত আছেঃ
” নব ভব চাল ছায়
বেনী খড় এগিয়ে দেয় …। “
ছাত্রাবস্থাতেই তিনি অনেক ছড়া ও কবিতা লিখেছেন যা তখনকার দিনের নানান পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । তিনি নারিটের পাঠশালা থেকে আমতা পীতাম্বর এম ই স্কুলে ভর্তি হন এবং এখানের পড়া শেষ করে তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন পড়াশোনার জন্য । কিন্তু শারীরিক অসুস্হতা তাঁর পড়াশোনার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় । সেই সময় সুচিকিৎসার অভাব তাঁর শারীরিক অসুস্হতার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে । এন্ট্রাস পাশ করা তাঁর হয়নি কিন্তু ব্যাকরণ শাস্ত্রে তখনই তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত । তাঁর পড়াশোনা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি । তবু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে না পারলেও পড়াশোনা , সাহিত্যচর্চায় তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ছিল । পড়াশোনা ছাড়া একটি দিনও অতিবাহিত করা তাঁর কাছে ছিল অতীব নিরানন্দের বিষয় ।

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya) সংসার জীবন এবং কর্ম জীবনঃ

নব কৃষ্ণ ভট্টাচার্যের পারিবারিক বিষয় সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না । একটু বেশি বয়সেই নবকৃষ্ঞের বিয়ে হয় আমতা থানার ইসলামপুর গ্রামের ভগবতী চরণ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সুশীলা দেবীর সঙ্গে । পাঁচ সন্তানের ( তিন পুত্র – সুকুমার , সুপ্রভাত ও গোকুলেশ্বর এবং দুই কন্যা গান্ধ ও মান্ধ নামে পরিচিত ) পিতা নবকৃষ্ঞ অত্যন্ত সন্তান বৎসল ছিলেন । স্ত্রী এবং পরিবারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা অনেক কৃচ্ছ সাধনে বাধ্য করেছে তাঁকে । বেশ অল্প বয়স থেকেই তাঁকে অর্থের চিন্তা করতে হয়েছে । পারিবারিক দায়দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি স্কুল পাঠ্য বাংলা , ইতিহাস প্রভৃতি গ্রন্থ লিখতে হয়েছে ।
কবির পুত্র সুপ্রভাত ভট্টাচার্যের কথায়ঃ ” আমরা দেখেছি প্রকাশকরা কেউ তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বই বা পঞ্চম শ্রেণির ইতিহাস বই ….. এইরকম বহু স্কুল পাঠ্য বই বাবাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে যেত , তার জন্য টাকা দিত বাবাকে । কিন্তু বইয়ে বাবার নাম থাকত না , নাম থাকত প্রকাশকদের । এমন কত লোককে যে কত বই লিখে দিয়েছেন ………. তার ঠিক নেই । আমার মনে হয় , বাবাকে যদি এতখানি অর্থ চিন্তা না করতে হোত , তাহলে বাবা অনেক দূর যেতে পারতেন । ” প্রয়োজন মত অর্থের অভাবে খুবই দূরবস্থার মধ্যে কাটাতে হয়েছে তাঁকে কিন্তু কোন অবস্থাতেই ভেঙে পড়েননি । সামান্য অর্থের বিনিময়ে বই এর সত্ত্ব বিক্রি করে দিয়েছেন ।

পরীক্ষক যখন কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya)

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কবির লেখার একজন মুগ্ধ পাঠক ছিলেন । তিনি নবকৃষ্ঞকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষক নিয়োগ করেছিলেন বলে শোনা যায় । আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাবার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ম্যাট্রিকুলেশানের বাংলার পরীক্ষকও নিযুক্ত হয়েছিলেন । অথচ তিনি প্রবেশিকা পাশ করেননি । তখন বাংলার প্রধান পরীক্ষক ছিলেন ভাষাচার্য ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় । তিনি নবকৃষ্ঞের কাজের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন । ডঃ চট্টোপাধ্যায় একবার পরীক্ষকদের মিটিং এ বলেছিলেনঃ ” এই একজন এগজামিনার , এত সার্প ব্রেন , নীট এণ্ড ক্লীন ….. নির্ভুল কাজ , কোন পরীক্ষকের নেই । “

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya) রচনাবলিঃ

কবির প্রথম বই- বাঙালির ছবি -১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত , পরবর্তীকালে ” রং চং ” নামে পরিবর্ধিত আকারে প্রকাশিত । তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে — ” শিশু রঞ্জন রামায়ণ ( জানুয়ারি ১৮৯১) , ছেলেখেলা (১৮৯৮) , টুকটুকে রামায়ণ (১৯১০) , ছবির ছড়া ( ১৯৩৬) ” ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । বড়দের জন্য তাঁর কবিতার সংকলন – ” পুষ্পাঞ্জলি ” । এছাড়াও ” ছড়া ও কবিতা , ছবি ও ছড়া ” এবং বহু পাঠ্যপুস্তকও তিনি রচনা করেন ।

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (Navkrishna Bhattacharya)  সম্পাদিত গ্রন্থঃ

মহাকবি কৃত্তিবাস বিরচিত সপ্তকাণ্ড রামায়ণ এবং মহাকবি কাশীরাম দাস বিরচিত অষ্টাদশ পর্ব মহাভারত তাঁর সম্পাদনায় সচিত্র আকারে প্রকাশিত হয় । নবকৃষ্ঞ ভট্টাচার্য এবং তাঁর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু প্রসিদ্ধ শিশু সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সংকলন গ্রন্থ –” আগমনী ” । নবকৃষ্ণের সংকলিত “কবিতা কুসুম ” গ্রন্থখানি তখনকার দিনে বিশেষ সমাদর লাভ করে ।